Monday, February 7, 2022

 নিউয়র্ক - স্মৃতি রোমন্থন, সন ২০১১


একদিন ভোরে বসন্তের ঘুম ভেঙে যায়। সকালে উঠে জানলার দুপাটি  ঠেলে দেখি আলতো ঠান্ডা হাওয়া গা ছুঁয়ে চলে গেলো, গায়ে তেমন লাগলো না।  ঈশান এখনো ঘুমন্ত। জানলার বাইরে দেখি কুইন্সবোরো ব্রিজের মাথায় বসে খানসাহেব মেজাজে সিন্ধি ভৈরবী ধরেছেন। পাশে জাকির সাহেব, মুখে আলতো হাসি। খানসাহেবের  মেজাজটা ধরেছেন। ম্যানহাটানের রাস্তায় গাড়ির ভিড় তেমন নেই. খানসাহেবের  সেতার ছড়িয়ে যাচ্ছে দূরে, দিগন্তের ওপারে। এক দমকায় মনটা হালকা হয়ে ওঠে। চোখ তুলে দেখি দেশপ্রিয় পার্কের ওপারে আলো ফুটছে আকাশে। "ফেব্রুয়ারী কি চলে এল ?" আপনমনে শুধোই নিজেকে। এলিয়ট সাহেব বলেছিলেন "April is the  cruellest  month "। আমার তো মনে হয়, ফেব্রুয়ারীর মতন নিষ্ঠুর মাস আর হয় না - কখন আসে, কখন যায়, বুঝতেই পারা যায় না। ঈশানের কান্নায় চটক কাটে। এই বার পরবাসীর দিনের দমকল চলতে শুরু করবে। 


ঈশানের সারা দিনের দায়িত্ত্বের মধ্যে শুধু সকাল আর গভীর রাত্রিটাই আমার। বসন্তের ঠাহর যে তার খুব একটা কিছু হয়েছে বোঝা গেলো না। সকালের দুধ আর সিরিয়াল খেতে ঠিক তেমনটি ৪৫ মিনিট লাগলো। ভীরু মধ্যবিত্ত বাঙালি বাপের  মতন আমি এই সকালেও তার গায়ে মোটা একটা জ্যাকেট চাপিয়ে দিলুম। সুজাতার তুলনায় আমার সকালটা অনেক সরল। রাস্তা পার হয়ে ক্যাম্পাস এর মধ্যে ডে কেয়ার। সেখানে তাকে অর্পণ করেই আমার দায়িত্ব থেকে মুক্তি। রাস্তায় যেতে যেতে ঈশান এর ইতালীয় বান্ধবী র সঙ্গে দেখা। তার মনেও  বসন্তের ছোঁয়াচ লেগেছে। শুধুমাত্র গোলাপি স্কার্ট আর টি-শার্ট  পরিহিতা বান্ধবী কে দেখে আমার পুত্রের মনেও রং লাগে। সে জ্যাকেট টেনে ছুঁড়ে ফেলে তার সঙ্গে দৌড় লাগায়। দুরু দুরু বক্ষে আমি তার পেছন পেছন নিউইয়র্কের  রাস্তা পার হই - ফুল ফুটুক কি না ফুটুক, আজ বসন্ত। 


ল্যাবের মধ্যে ঢুকে বসন্ত প্রমাদ গোনে। বিজ্ঞান এর জগতে বসন্তের স্থান নেই. সব দিনই কঠিন কঠোর শীত.  ল্যাবে  ঢোকবার মুখে হঠাৎ অনেক পুরোনো একটা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারে। এদিক ওদিক তাকিয়ে ঠাহর হয় যে আমার নোবেলজয়ী অভিবাবক এর এর কমলালেবু গাছে মুকুল এসেছে। ঠান্ডার জন্যে ল্যাবের ঠিক বাইরে , বিল্ডিং এর মধ্যে রাখা ছিল, কিন্তু তাতে কি ? ঠান্ডার পর্দা ভেদ করে যেমন  বসন্তের আগমন, ঠিক তেমনি প্রকৃতির নিয়মে ম্যানহাটানের ওপর তার মনমাতানো গন্ধ নিয়ে কমলালেবুর মুকুল হাজির হয়েছে আমার ছোটবেলার স্মৃতির সম্ভার নিয়ে, দরজায় টোকা মেরে। কমললেবুর ফুলের গন্ধের সঙ্গে কলকাতার কোন গন্ধের মিল  ভাবতে ভাবতে আমি ল্যাব এ ঢুকে পড়ি - শীত গ্রীষ্ম বসন্ত মিশে যায়  দৈনন্দিন কাজের টানাপোড়েনে। 


দুপুরবেলায় খেতে যাবার জন্যে বাড়ির দিক এ পা বাড়িয়ে দিয়ে খেয়াল হয় যে শীতবুড়োর যাবার পালা আগতপ্রায়। এখন আর ঠান্ডা প্রায় নেই বললেই চলে. রাস্তায় পা বাড়িয়ে খেয়াল হয় যে হাতে বিন্দু বিন্দু  ঘাম জমেছে।  গরমের মধ্যে  মাথার প্রান্ত থেকে আঙ্গুল অবধি বওয়া ঘাম নয় , শীত এর সকাল এ শিশির বিন্দু র মতন জমা ঘাম, যা দেশে  বইমেলা যাবার সময় বাস এ উঠে প্রথম টের পেতুম। আচ্ছা, আজকে বইমেলা র শেষ দিন না কলকাতায় ? পৃথিবীর সব জায়গায় কি একই  সঙ্গে বসন্ত আসে ? গেট খুলে রাস্তায় বার হবার সময় হঠাৎ মনে হয় -" এমন দিনে তারে বলা যায় ", কিন্তু বলেছিলুম কি ? 


বাড়িতে ফিরে স্যান্ডউইচ বানাতে বানাতে শুনি খোলা জানালার বাইরে থেকে ভেসে আসছে ভীমপলাশ্রী। উঁকি মেরে দেখি খানসাহেব রাগত মুখ করে বাজাচ্ছেন। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন - গত সংখ্যার দেশে  নীলাক্ষ লিখেছিল  না, যে আমার দিন শেষ ? ডাক দেখি কাকে ডেকে আনবি। "ম্যায় বিলায়েত  খান বোল রাহা হুঁ, হ্যায় কোই সামনে আনেওয়ালা ?" মন চায় খানসাহেবের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে ওঁকে আশ্বস্ত করতে কিন্তু সে ধৃষ্টতা এ অধমের সাহসে কুলোয় না।   আনমনে খোলা জানলার সামনে বসে খানসাহেবের বাজনা শুনি আর ভাবি এমন একটা দিনের জন্যে কলকাতাবাসী কি না করতে পারতো। ঠিক এমন একটা দিনের জন্যে অপেক্ষা করে থাকে কলকাতাবাসী সারা বছর, ঠিক এমন একটা দুপুরে ব্রাহ্মমুহূর্তে বইমেলা প্রাঙ্গনে  ফিশ ফ্রাই খেতে খেতে সঙ্গিনীর চোখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড   ধরা দেয়, ভিড়ের ধাক্কা খেতে খেতে বসন্তের নির্ভুল অস্ত্র সানায় বুকের ভেতর - ফুল ফুটুক কি না ফুটুক, আজ বসন্ত। 


পরবাসী  জীবনের ভার ছাড়ানো বড়ো দায় - আজকে যেতে হবে জ্যাকসন হাইটস এ বাজার করতে। সময়ের তাল ভুলে আজ যাবার সময় বাস ধরি, মেট্রো রেলের  বদলে।  কুইন্সবোরো ব্রিজ পার হবার সময় শুনি খানসাহেব সাঁজ সারাবালী ধরেছেন খোশ মেজাজে। দুপুরের রাগত মেজাজ উধাও, ধীর লয়ে আলাপ শুরু করেছেন, এখন বাজনা চলবে অনেকক্ষণ। আজ নিউয়র্কবাসীর মনেও রং লেগেছে, বাস ড্রাইভার হালকা  মেজাজে চালিযে নিয়ে যায়  জ্যাকসন হাইটস এর পানে। বাস থেকে নেমে দেখি গোটা জ্যাকসন হাইটসে  উপমহাদেশের লোক বসন্ত উদযাপনে নেমে পড়েছে - জ্যাকেট নেই কারুর গায়ে। রেস্তোরাঁতে, দোকানপাটে, পানের দোকানে, মায়ে মুদিখানার দোকানে লোকের মনে রং লেগেছে আজ। বয়স্ক সর্দারজী হালকা গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে ক্রেডিট কার্ড চালিয়ে দেন যন্ত্রের মধ্যে - "সব কুছ ঠিক তো হয় বেটা ?" আমি ঘাড় নাড়ি , তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, ঈশানের রাত্রের ঘুম এর দায় আমার ঘাড়ে ! 


ফেরবার সময় খানসাহেব এর দেখা মেলে না, বাজনা বোধ হয় অনেকক্ষন শেষ হয়েছে, নির্ঘাত রাত্রের মতন ঘুমোতে গেছেন। আমি বাজার রেখে রাত্রের খাওয়া শেষ করে আবার ল্যাবের দিকেও রওনা হই. দিনের হালকা কবোষ্ণ ভাব উধাও, শীতবুড়ো  আবার কামড় বসাবে কি না ঠাহর করতে পারছে না। ম্যানহাটানের রাস্তা আস্তে আস্তে হালকা হবার দিকে - ল্যাবে এখনো অনেক কাজ পড়ে, বিজ্ঞান কি আর বসন্তের কদর করে ? 


রাত্রিবেলা ল্যাবের  মেজাজ পাল্টে যায়, সবাই থাকে না, দিনের খোলস ভেদ করে হঠাৎ সহকর্মীর মনের কথা বাইরে চলে আসে।  অনেক অনেক দিন আগে উচ্চাকাঙ্ক্ষাতে ভর করে চলে এসেছিলাম আমরা সবাই সাগরপারে, বসন্ত সে কথা মনে করিয়ে দেয় সবাইকে। জানলার বাইরে অন্ধকার ভেদ করে কুইন্সবোরো  ব্রিজের বাতিস্তম্ভের আলো দেখতে দেখতে আমি ভাবি আমার চীনে সহকর্মীর শহরেও  বইমেলা হয় কি না।  বসন্ত বোধ হয় বিজ্ঞানের গায়েও ছোঁওয়া লাগিয়েছে দিনের শেষে, তাই সব শ্রমই বিফলে যায় না, পরিশ্রান্ত দিনের শেষে  পড়ে  পাওয়া চোদ্দ আনা কিছু বাকি থাকে, তাই নিয়েই ল্যাব বন্ধ করে পাড়ি দি, রাস্তা পার হয়ে বাড়ির দিকে। 


বাড়ির চারিদিক স্তব্ধ চুপচাপ, ঘুমন্ত ঈশানের মুখে রাস্তার আলো পড়ে  পিছলে যাচ্ছে। শেষ বারের মতন জানলার কাছে এসে বন্ধ করার আগে হঠাৎ শুনি সেই আওয়াজ। মুখ বাড়িয়ে দেখি খানসাহেব এসে বসেছেন ব্রিজের মাথায়, ঠিক ছোটবেলায় দেখা এলপি রেকর্ডের ছবির  মতন, পিঠে আলতো করে ফেলা একটা কালো শাল, দৃষ্টি আকাশ আর সেতারের মাঝে কোথায় নিবদ্ধ, খানসাহেব দরবারী তে আলাপ ধরেছেন। একটু দূরে শঙ্কর  ঘোষ এসে বসেছেন, চুপ করে বসে শুনছেন খানসাহেব এর আলাপ। ম্যানহাটানের রাস্তায় সোনালী আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে দু একটা গাড়ি শেষ রাতের সফর সেরে ফিরছে কুলায় আর দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে ছড়িয়ে  যাচ্ছে খানসাহেবের  বাজনা।  ঠিক ঠাহর হয় না দূরে শাহজাহান আর মুমতাজমহল এসে বসেছেন কি না। আমার খুব ইচ্ছে হয় একবার খানসাহেবকে  জিজ্ঞেস করি  - "এতো দুঃখ কোথায় রাখেন খানসাহেব ? খালি কি বাজনার সময়তেই বার হয় ?" কিন্তু এখন কথা বলবার সময় নয় - খানসাহেবের বাজনা শুনে ঈশান ঘুমের মধ্যে খিলখিলিয়ে হেসে পাশ ফেরে। তা দেখতে দেখতে শ্ৰান্ত আমি ঘুমিয়ে পড়ি - কাল বসন্তের দ্বিতীয় দিন !




No comments: